সত্যের সন্ধানে বিশ্বজুড়ে, প্রবাসের খবর সবার আগে।
পোর্টাল: anb24.net | প্রিন্টের সময়: ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:৩৩ এএম
আইনশৃঙ্খলা থেকে নাগরিক অধিকার: রাষ্ট্র ও সমাজের দায় কোথায়?
মোঃ শাহজাহান বাশার
আইনশৃঙ্খলা থেকে নাগরিক অধিকার: রাষ্ট্র ও সমাজের দায় কোথায়?
নিউজ ডেস্ক
একটি রাষ্ট্রের অগ্রগতি শুধু উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়। একটি দেশের প্রকৃত অগ্রগতি বোঝা যায় তার সাধারণ নাগরিক কতটা নিরাপদে জীবনযাপন করছেন, ন্যায়বিচার কতটা সহজলভ্য, সরকারি সেবা কতটা স্বচ্ছ এবং মানুষ তার অধিকার নিয়ে কতটা নিশ্চিন্ত—তার ওপর।
সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশাও বদলেছে। এখন মানুষ শুধু উন্নয়ন চায় না; তারা উন্নয়নের সুফল, সুশাসন, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারও চায়। তাই আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্য, নাগরিক অধিকার ও সাংবাদিকতার ভূমিকা—এই বিষয়গুলোকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। একটি বিষয় অন্যটির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
আইনশৃঙ্খলা ভালো থাকার অর্থ শুধু অপরাধ কমে যাওয়া নয়। একজন নাগরিকের মনে এই বিশ্বাস তৈরি হওয়াও জরুরি যে, তিনি বিপদে পড়লে আইনের আশ্রয় পাবেন এবং অপরাধী যতই প্রভাবশালী হোক, আইনের আওতায় আসবে।
আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হয়, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ে। বিপরীতে, আইনের প্রয়োগে বৈষম্য বা বিচারপ্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রতা মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করতে পারে।
তাই অপরাধ দমনের পাশাপাশি প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়িত্বশীল আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার এবং আইনের শাসনের বাস্তব প্রয়োগ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা একটি স্থিতিশীল সমাজের অন্যতম ভিত্তি।
দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না; এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের মধ্যকার আস্থার সম্পর্কও দুর্বল করে।
একজন নাগরিক যখন তার ন্যায্য সেবা পেতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য হন, অথবা বৈধ কাজ সম্পন্ন করতে অযথা হয়রানির শিকার হন, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু তিনি নন—ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা।
দুর্নীতি প্রতিরোধে শুধু অভিযান কিংবা মামলা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কার্যকর জবাবদিহি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, সেবাব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধও গড়ে তুলতে হবে। কারণ দুর্নীতিকে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা হিসেবে দেখলে এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
দ্রব্যমূল্য নিয়ে আলোচনা হলে আমরা প্রায়ই বাজারদর ও অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের কথা বলি। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের কাছে দ্রব্যমূল্যের বাস্তবতা আরও সহজ—মাসের আয় দিয়ে মাসের প্রয়োজনীয় খরচ মেটানো যাচ্ছে কি না।
খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থান ও যাতায়াতের ব্যয় যখন মানুষের আয়কে ছাড়িয়ে যেতে থাকে, তখন তার প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় এর চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়।
বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, মজুতদারি, কারসাজি কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা থাকলে তা চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রয়োজন।
মানুষকে শুধু বাজারদর কমার প্রতিশ্রুতি নয়—একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য বাজারব্যবস্থার নিশ্চয়তাও দিতে হবে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার নাগরিক। নাগরিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা, ন্যায়বিচার, মতপ্রকাশ এবং আইনগত অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।
তবে অধিকার যেমন আছে, তেমনি নাগরিকের দায়িত্বও রয়েছে। অন্যের অধিকারকে সম্মান করা, আইন মেনে চলা, গুজব ও অপতথ্য থেকে দূরে থাকা এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখাও নাগরিক দায়িত্বের অংশ।
রাষ্ট্র ও নাগরিক—উভয় পক্ষ দায়িত্বশীল হলে একটি সহনশীল, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক সমাজ গড়ে ওঠে।
এই জায়গায় সাংবাদিকতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকতা শুধু সংবাদ প্রকাশের পেশা নয়; এটি মানুষের জানার অধিকার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
দুর্নীতি, অনিয়ম, অপরাধ কিংবা মানুষের দুর্ভোগের খবর তুলে ধরা সাংবাদিকতার দায়িত্ব। তবে অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার আগে তথ্য যাচাই, প্রমাণ সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একটি ভুল সংবাদ শুধু একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করে না; এতে গণমাধ্যমের ওপর মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই সময়ে যাচাইহীন তথ্য খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাই পেশাদার সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত—তথ্য, অনুসন্ধান, সত্যতা ও দায়িত্বশীলতা।
সাংবাদিককে প্রশ্ন করতে হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তবে একই সঙ্গে সাংবাদিকতাকে হতে হবে নীতিনিষ্ঠ, তথ্যভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ।
স্বাধীন সাংবাদিকতা মানে কারও বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন সাধারণ নাগরিক নিরাপদে রাস্তায় চলতে পারবেন; আইনের আশ্রয় নিতে গিয়ে বৈষম্যের শিকার হবেন না; সরকারি সেবা পেতে হয়রানির মুখোমুখি হবেন না; বাজারে ন্যায্য দামে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারবেন এবং নিজের মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হবেন না।
আমরা এমন একটি প্রশাসন চাই, যেখানে জবাবদিহি থাকবে; এমন একটি বাজার চাই, যেখানে ভোক্তার স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে; এমন একটি বিচারব্যবস্থা চাই, যেখানে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা বাস্তবে প্রতিফলিত হবে; এবং এমন একটি গণমাধ্যম চাই, যেখানে সত্য ও জনস্বার্থ সংবাদ প্রকাশের মূল ভিত্তি হবে।
দেশ এগিয়ে যাওয়ার জন্য শুধু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নাগরিকের সচেতনতা, প্রশাসনের জবাবদিহি, রাজনৈতিক ও সামাজিক সহনশীলতা এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যম।
আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে আইনের শাসনের মাধ্যমে। দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে হবে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন কার্যকর বাজারব্যবস্থা। নাগরিক অধিকার রক্ষায় প্রয়োজন রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ভূমিকা। আর এসব বিষয়কে জনগণের সামনে তুলে ধরতে সাংবাদিকতাকে থাকতে হবে সত্য, ন্যায় ও জনস্বার্থের পক্ষে।
কারণ রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু তার প্রতিষ্ঠান কিংবা ক্ষমতার কাঠামোতে নয়—রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ও নাগরিকের মর্যাদা রক্ষার সক্ষমতার মধ্যেই একটি দেশের প্রকৃত শক্তি নিহিত।
আজকের বাংলাদেশে তাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন—আইনের শাসন, সুশাসন, জবাবদিহি, মানবিকতা ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সমন্বিত চর্চা।
এ পথ যত শক্তিশালী হবে, রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক আস্থাও তত গভীর হবে। আর সেই আস্থার ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠতে পারে আরও নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ।
লেখক: মোঃ শাহজাহান বাশার (সাংবাদিক, দৈনিক জনতার মতামত, দৈনিক মানবাধিকার প্রতিদিন ও দৈনিক আগামীকাল,যুগ্ম আহ্বায়ক, বাংলাদেশ অনলাইন গণমাধ্যম প্রকাশক ও সম্পাদক পরিষদ)
পাঠকদের মতামত 0
শালীন ও গঠনমূলক মন্তব্য কাম্য(no title)
৯ ঘণ্টা আগেবাঁচার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন তাজমিন, আলামত মিলল ধানক্ষেতে
১৬ ঘণ্টা আগেবিএসপির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানকে নবনিযুক্ত মহাসচিব অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আলী চৌধুরী মানিকের ফুলেল শুভেচ্ছা
১৭ ঘণ্টা আগেবুড়িচংয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার কথা জানালেন সাইফুল ইসলাম টিপু
০৭ অক্টোবর, ২০২৬মুক্তিযুদ্ধে ফরাসি বন্ধু আঁদ্রে মালরো: বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে এক বিশ্বমানবের অঙ্গীকার
০৭ অক্টোবর, ২০২৬দাউদকান্দি মডেল থানার বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ১২ পুরস্কার অর্জন
০৭ অক্টোবর, ২০২৬অনলাইন জরিপ (Poll)
সকল পোল »আপনি কি মনে করেন চলতি মেয়াদে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারবে?
ফটো কার্ড স্টাইল নির্বাচন করুন
সংবাদের ছবি দিয়ে কিভাবে ফটো কার্ডটি ডাউনলোড করতে চান অপশন সিলেক্ট করুন
ANB24.NET
সত্যের সন্ধানে বিশ্বজুড়ে, প্রবাসের খবর সবার আগে।
আইনশৃঙ্খলা থেকে নাগরিক অধিকার: রাষ্ট্র ও সমাজের দায় কোথায়?
আইনশৃঙ্খলা থেকে নাগরিক অধিকার: রাষ্ট্র ও সমাজের দায় কোথায়?
ANB24.NET
সত্যের সন্ধানে বিশ্বজুড়ে, প্রবাসের খবর সবার আগে।