
বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ ঘিরে পুলিশ নেতাকর্মীদের ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করেছে বলে দলটি অভিযোগ করেছে। দলটি বলছে, এরই মধ্যে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় বিএনপির নেতাকর্মীর নামে মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে গত বুধবার নয়াপল্টনে পুলিশ-বিএনপির নেতাকর্মীর সংঘর্ষের ঘটনায় ৩টি পৃথক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এরই মধ্যে ১ হাজারের বেশি নেতাকর্মী পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে বলে দাবি বিএনপির।
বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে। ফলে বিএনপি, অঙ্গ ও সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী গ্রেপ্তার আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। তারা গ্রেপ্তার আতঙ্কে এখন ঘরছাড়া। কেউ কেউ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বন্ধু বা আত্মীয়ের বাড়িতে থাকছেন। অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়িতে প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে সেখানেই রাতযাপন করছেন।
সারা দেশে দলের নেতাকর্মীর ওপর পুলিশের নিপীড়ন ও মামলার কথা তুলে ধরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল বলেছেন, ঢাকার সমাবেশের ভেন্যু নির্ধারণ নিয়ে ডিএমপি কমিশনার নিজেই তার কার্যালয়ে আমাদের দলের নেতা এ্যানিকে পাঠানোর কথা আমাকে জানায়। এ্যানি সাহেব যখন ডিএমপিতে যাওয়ার জন্য বের হবেন, ঠিক তখনই তাকে গ্রেপ্তার করেছে।
ঢাকা বিভাগের কয়েকটি জেলার নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, আগামীকাল ১০ ডিসেম্বর বিভাগীয় গণসমাবেশে যোগ দিতে তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নেতাকর্মীদের অনেকেই ঢাকামুখী। ঢাকা বিভাগের বাইরেও অন্য জেলা থেকে কিছু নেতাকর্মী ঢাকায় এসে পৌঁছেছেন। ঠিক এ সময়ে গত বুধবার নয়াপল্টনে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশ যে আক্রমণ চালিয়েছে, তা তাদের উদ্বিগ্ন করেছে। সেই সঙ্গে নতুন নতুন মামলা হওয়ায় তাদের আরও বেশি ভাবিয়ে তুলেছে। এখন যে কোনো মূল্যে ১০ ডিসেম্বরের বিভাগীয় গণসমাবেশ সফলের জন্য তারা গ্রেপ্তার এড়াতে কৌশল অবলম্বন করছেন। তারা জানান, যেভাবেই হোক বিএনপিকে গণসমাবেশ সফল করতে হবে। কতজনকে গ্রেপ্তার করবে? কতজনকে মারবে?
নরসিংদী জেলা বিএনপির সদস্য রফিকুল আমিন ভূঁইয়া রুহেল কালবেলাকে বলেন, ‘রাজনীতি করি সাধারণ মানুষের জন্য। এই যে হামলা-মামলা ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, বিনিময়ে আমরা কী পাচ্ছি? শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের নব্য ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করার জন্য আমরা রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করছি। আমরা এলাকায় যেতে পারি না। বাড়িতে থাকতে পারি না। এমনকি নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দূরে কোথাও যেতেও পারি না। ফলে বাধ্য হয়েই বন্ধু বা আত্মীয়ের বাসায় কষ্ট করে রাতযাপন করতে হচ্ছে। কখনো কখনো গাড়িতেই রাতযাপন করতে হচ্ছে। তিনি মনে করেন, যেভাবেই হোক ১০ ডিসেম্বরের সমাবেশ সফল করতে বিএনপিকে কঠোর অবস্থানে যেতে হবে। কারণ, হামলা-মামলা বিএনপি নেতাকর্মীদের কাছে গা-সওয়া হয়ে গেছে।’
নওগাঁর যুবদল নেতা মুক্তার হোসেন ও টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির কয়েকজন নেতা কালবেলাকে বলেন, তারা ঢাকার সমাবেশ সফলের জন্য ঢাকায় এসে আত্মীয়ের বাসায় উঠেছেন। নয়াপল্টনের আশপাশে ঘুরে-ফিরে বেড়িয়েছেন। কিন্তু বুধবার পুলিশ যেভাবে বিনা উসকানিতে আক্রমণ চালিয়েছে তাতে তারা কিছুটা আতঙ্কিত হয়েছেন। তবুও বিএনপির হাইকমান্ড সমাবেশের জন্য অনড় থাকলে তারা যোগ দেবেন বলে জানান।
বিএনপির কেন্দ্রীয় সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু কালবেলাকে বলেন, এরই মধ্যে নয়াপল্টনে সংঘর্ষের ঘটনায় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নতুন মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে সাড়ে চার শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সারা দেশের হামলা-মামলা হলেও বিএনপির কোনো নেতাকর্মী আতঙ্কিত নন। কারণ, তারা মামলাকে আর ভয় পাচ্ছেন না। হয়তো গ্রেপ্তার এড়াতে কৌশলী হয়ে অন্য কোথাও থাকার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, যে কোনো মূল্যে ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশ সফল করতে বিএনপির নেতাকর্মীরা সর্বাত্মকভাবে প্রস্তুত।
তিন মামলায় আসামি ৩ হাজার
এদিকে রাজধানীর নয়াপল্টন এলাকায় পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষের ঘটনায় ৩টি মামলা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে উপকমিশনার ফারুক হোসেন জানান, ঢাকা মহানগর পুলিশের পল্টন, মতিঝিল ও শাহজাহানপুর থানায় মামলাগুলো হয়েছে। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার এবং প্রায় ৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পল্টন থানায় সরকারি কাজে বাধাদান, পুলিশের ওপর হামলা এবং বিস্ফোরক আইনে মামলা করা হয়েছে। এই মামলায় ৪৭৩ জন আসামির নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং প্রায় আড়াই হাজার অজ্ঞাতপরিচয় আসামির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মতিঝিল থানায় বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা করা হয়েছে। সেখানে ২৮ জনের নামে মামলা করা হয়েছে। শাহজাহানপুর থানায়ও বিস্ফোরক আইনের মামলায় ৫২ বিএনপি নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে তাদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকিদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চলছে।
তিনি বলেন, ওইদিনের সংঘর্ষে ৪৭ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। ১৬ জনকে রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল ও একজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ৩০ পুলিশ সদস্য রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
পল্টন থানায় পুলিশের ওপর হামলা ও বিস্ফোরক আইনের মামলায় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আবদুস সালাম, উত্তরের আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস ও কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানিসহ ৪৭৩ জনকে এজাহারনামীয় আসামি করা হয়েছে।
মতিঝিল থানার মামলায় উপপরিদর্শক (এসআই) নজরুল ইসলাম সিকদার বাদী হয়ে মো. জামিল হোসাইন, মো. আনোয়ার হোসেন ও মো. হারুন অর রশিদসহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন। শাহজাহানপুর থানার মামলায় সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন, রাজধানীর হাতিরঝিল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ইবাদুল বেপারি ও শাহজাহানপুর থানা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মো. এইচ কে হোসেন আলীসহ ৫২ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ২০০ থেকে ২৫০ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।





